বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১): উসমানীয় সাম্রাজ্যের উত্থান ও বিশ্ব শাসনের শুরু
Date: 2026-10-01
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ০১, ২০২৬, ৪:৫০ এ.এম
বিশ্বরাজনীতি (পর্ব ১): উসমানীয় সাম্রাজ্যের উত্থান ও বিশ্ব শাসনের শুরু
অ-অ+
বিশেষ সিরিজ:
(যুদ্ধ, সাম্রাজ্য ও ভূ-রাজনীতি: বিশ্ব শাসনের ইতিহাস)
আজকের আধুনিক বিশ্বরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের জটিল সমীকরণ বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে মধ্যযুগের বিশ্বমঞ্চে। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার সংযোগস্থলে গড়ে ওঠা উসমানীয় সাম্রাজ্য কীভাবে বিশ্বের ভূ-রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল, তা ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়। ১২৯৯ সালে প্রথম উসমান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই তুর্কি সাম্রাজ্য এক ক্ষুদ্র সর্দারত্ব বা বেইলিক থেকে শুরু হয়ে পরবর্তীতে তিন মহাদেশজুড়ে বিস্তৃতি লাভ করে এবং তৎকালীন বিশ্ব শাসনের প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।
উসমানীয় সাম্রাজ্যের আসল ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ও গুরুত্ব বিশ্বমঞ্চে স্পষ্ট হয় ১৪৫৩ সালে। মাত্র ২১ বছর বয়সী তরুণ তুর্কি সুলতান দ্বিতীয় মেহমেদ তৎকালীন সুসংগঠিত বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল জয় করেন। ঐতিহাসিক এই বিজয়ের পর কনস্টান্টিনোপলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ইস্তাম্বুল, যা পরবর্তীতে উসমানীয়দের মূল রাজধানীতে পরিণত হয়। এই এক বিজয়ের মাধ্যমেই অবসান ঘটে ১,১০০ বছরের পুরোনো বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের এবং বিশ্ব রাজনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যে সূচনা হয় এক নতুন মেরুকরণের।
কনস্টান্টিনোপল জয়ের পর প্রাচীন সিল্ক রোড এবং ভূমধ্যসাগরীয় গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথগুলোর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় উসমানীয়দের হাতে। তৎকালীন সময়ে এশিয়া থেকে ইউরোপে মসলা, রেশম ও গুরুত্বপূর্ণ মালামাল পরিবহনের একমাত্র প্রধান পথ ছিল এটি। উসমানীয়রা ইউরোপীয় বণিকদের ওপর চড়া শুল্ক আরোপ ও বাণিজ্যে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করায় ইউরোপীয় রাজত্বগুলোর অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।
উসমানীয়দের এই বাণিজ্য শুল্ক এবং বাণিজ্যিক বাধা এড়াতে বাধ্য হয়ে ইউরোপীয় দেশগুলো বিকল্প জলপথ অনুসন্ধানে মনোযোগী হয়। ইতিহাসবিদদের মতে, উসমানীয়দের সৃষ্টি করা এই অর্থনৈতিক চাপই বিশ্বে ভৌগোলিক আবিষ্কারের যুগের জন্ম দেয়। বিকল্প বাণিজ্য পথ খুঁজতে গিয়ে ১৪৯২ সালে ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকার উপকূলে পৌঁছান এবং ১৪৯৮ সালে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো দা গামা আফ্রিকাকে প্রদক্ষিণ করে ভারতে আসার সরাসরি সমুদ্রপথ আবিষ্কার করেন। ফলে বর্তমান উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের সন্ধান কিংবা ভারতীয় উপমহাদেশে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর বাণিজ্যিক ও সামরিক আগমনের পেছনে পরোক্ষভাবে মূল ভূমিকা পালন করেছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের বাণিজ্যনীতি।
ষোড়শ শতাব্দীতে সুলতান প্রথম সেলিমের আমলে মিশর ও পবিত্র নগরী মক্কা-মদিনা উসমানীয়দের অধীনে আসে, যার মাধ্যমে উসমানীয় সুলতানরা সমগ্র মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। পরবর্তীতে সুলতান সুলাইমান দ্য ম্যাগনিফিসেন্টের আমলে এই সাম্রাজ্য মধ্য ইউরোপ থেকে শুরু করে উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। তৎকালীন সময়ে ইউরোপের শক্তিশালী ক্যাথলিক রাজতন্ত্রগুলোর উত্থান রুখতে উসমানীয়রা ইউরোপের প্রোটেস্ট্যান্ট দল এবং ফ্রান্সের সাথে রাজনৈতিক সমঝোতা ও সামরিক মিত্রতা গড়ে তোলে, যা ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি বদলে দিয়েছিল।
উসমানীয় সাম্রাজ্যের এই অভূতপূর্ব উত্থান কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত সম্প্রসারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে মুসলিম বিশ্বের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার গল্প। উসমানীয়দের উত্থানের ফলে ইউরোপে যে অর্থনৈতিক সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছিল, তার জের ধরেই পরবর্তীতে ইউরোপীয় পরাশক্তিগুলো বিশ্বজুড়ে ঔপনিবেশিক প্রভাব বিস্তারে মরিয়া হয়ে ওঠে এবং বিশ্ব রাজনীতির নতুন মানচিত্র আঁকতে বাধ্য হয়।
(আগামীকাল পর্ব ২-এ থাকছে: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ: একটি বাণিজ্যিক গোষ্ঠীর বিশ্ব শাসন)
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more