প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুলাই ৩১, ২০২৬, ৩:১৬ এ.এম
কাঁঠালের বীজ থেকে ‘মিনারেল কনসেন্ট্রেট’ উদ্ভাবন
অ-অ+
অনলাইন ডেস্ক:
একসময় কাঁঠাল খাওয়ার পর যে বীজ অবহেলা ও অনাদরে বর্জ্যের স্তূপে ফেলে দেওয়া হতো, সেই ফেলনা বীজ থেকেই এবার উদ্ভাবিত হলো উচ্চ পুষ্টিসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান। গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের উদ্ভাবিত কাঁঠালের বীজ থেকে ঘনীভূত খনিজসমৃদ্ধ খাদ্য উপাদান বা ‘মিনারেল কনসেন্ট্রেট’ তৈরির বিশেষ এই প্রযুক্তি সম্প্রতি সরকারের পেটেন্ট স্বত্ব লাভ করেছে।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান কাঁঠাল উৎপাদনকারী দেশ হলেও প্রতিবছর উৎপাদিত কাঁঠালের একটি বিরাট অংশের বীজ ও উপজাত বর্জ্য হিসেবে নষ্ট হয়ে যায়। কেবল গাজীপুর জেলাতেই বার্ষিক প্রায় ছয় হাজার টন কাঁঠালের বীজ অপচয় হয়। অথচ সাধারণ অবস্থায় ফেলে দেওয়া এই কাঁঠালের বীজে মানবদেহের জন্য অপরিহার্য নানা প্রকার খনিজ উপাদান বিদ্যমান থাকে। সেই বিপুল সম্ভাবনাময় উপাদানকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে কাজে লাগিয়ে নতুন এই খাদ্য প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ‘গ্র্যান্টস ফর অ্যাডভান্সড রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন’ প্রকল্পের আর্থিক সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এমদাদুল হক এবং স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী আকরাম হোসেন টানা তিন বছরের নিবিড় গবেষণার মাধ্যমে এ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রযুক্তিটি চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করে। পরবর্তীতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর প্রযুক্তিটিকে বুদ্ধিবৃত্তিক স্বত্ব হিসেবে সরকারি পেটেন্ট প্রদান করে।
গবেষণার প্রাপ্ত ফলাফলে দেখা যায়, সাধারণ শুকনা কাঁঠালের বীজে খনিজের পরিমাণ থাকে মাত্র ২ শতাংশের কাছাকাছি। তবে উদ্ভাবিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খনিজের ঘনত্ব প্রায় ১৬ থেকে ১৭ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে ৩৩ শতাংশের বেশি ‘মিনারেল কনসেন্ট্রেট’-এ রূপান্তর করা সক্ষম হয়েছে। উদ্ভাবকদের ভাষ্যমতে, এই পাউডার বা উপাদানটি প্রক্রিয়াজাত খাবারের মূল স্বাদ, গন্ধ বা ব্যবহারে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন না এনেই দৈনন্দিন খাবারের পুষ্টিমান বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।
এই মিনারেল কনসেন্ট্রেট ব্যবহারের ক্ষেত্র নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে গবেষক অধ্যাপক মো. এমদাদুল হক জানান, এটি অতি সহজে যেকোনো সাধারণ আটা বা ময়দার সঙ্গে মিশিয়ে পুষ্টিকর রুটি তৈরিতে ব্যবহার করা সম্ভব। এছাড়া বাণিজ্যিক খাদ্যশিল্পে বিস্কুট, কেক ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত পণ্যে এই উপাদান যুক্ত করলে সাধারণ মানুষের দৈনিক খনিজ চাহিদা পূরণে তা বিশেষ অবদান রাখবে।
এই প্রযুক্তি দেশের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি এবং খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ফেলনা বীজকে উচ্চ মূল্যসংযোজিত খাদ্য উপাদানে রূপান্তরের মাধ্যমে একদিকে যেমন কৃষিজাত বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে কাঁঠাল চাষি ও স্থানীয় কৃষকদের অতিরিক্ত আয়ের পথ প্রসারিত হবে।
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টিকে দেশের সামগ্রিক কৃষি ও খাদ্য গবেষণার জন্য এক যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “ফেলনা কৃষিজ বর্জ্যকে আধুনিক গবেষণার মধ্য দিয়ে মানবদেহের অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানে রূপান্তর করা সম্ভব—আমাদের গবেষকেরা সেটিই প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।”
উল্লেখ্য, ‘গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়’ নামে নতুনভাবে পথচলা শুরুর পর এটিই বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাপ্ত প্রথম পেটেন্ট সনদ। সামগ্রিকভাবে এটি তাদের উদ্ভাবিত ২১তম প্রযুক্তি। উদ্ভাবনটি বাণিজ্যিক পর্যায়ে সম্প্রসারিত হলে দেশে কাঁঠালভিত্তিক নতুন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠার পাশাপাশি সার্বিক পুষ্টি নিরাপত্তায় নতুন মাত্রার যোগসূচি রচিত হবে।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more