মর্ত্যে আসা দেবী দুর্গার চার সন্তানের রূপ ও প্রতীকী অর্থ
অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ৯:৪৭ এ.এম
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: অক্টোবর ১৮, ২০২৬, ৯:৪৭ এ.এম
মর্ত্যে আসা দেবী দুর্গার চার সন্তানের রূপ ও প্রতীকী অর্থ
অ-অ+
বিশেষ প্রতিনিধি চারদিকে পূজার আমেজ। ধূপ-চন্দনের গন্ধ আর ঢাকের আওয়াজে মুখরিত চারপাশ। দুর্গাপূজার
সপ্তমীতে মণ্ডপে মণ্ডপে শুরু হয়েছে দেবী আরাধনা। সনাতনী বাঙালির কাছে এই উৎসব শুধু
অসুরদলনী দেবী দুর্গার পূজা নয়, একই সঙ্গে কৈলাশ থেকে উমার ঘরে ফেরার আবেগেরও। প্রচলিত
বাঙালি প্রতিমায় মা দুর্গার দুই পাশে দেখা যায় তাঁর চার সন্তান—লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক
ও গণেশকে। সঙ্গে থাকে তাঁদের নিজ নিজ বাহনও। দেবীর পরিবারের এই সদস্যদের আসল পরিচয় কী? কোন দেবতার সঙ্গে কোন বাহন থাকে এবং
কেনই বা বাঙালির দুর্গাপূজায় তাঁদের একসঙ্গে আরাধনা করা হয়? সপ্তমীর এই শুভ ক্ষণে জেনে
নেওয়া যাক সেই পরিচিত, অথচ আকর্ষণীয় পৌরাণিক কাহিনি। বাঙালির পারিবারিক প্রতিমা ও রূপায়ণ বাঙালি দুর্গাপূজার প্রচলিত প্রতিমায় মা দুর্গার সঙ্গে দুই দেবী ও দুই দেবতাকে
দেখা যায়। হিন্দু পুরাণের বিভিন্ন গ্রন্থ ও আঞ্চলিক ঐতিহ্যে দেব-দেবীদের সম্পর্ক এবং
কাহিনির বিবরণে কিছু পার্থক্য থাকলেও, বাঙালির দুর্গাপূজায় এই পারিবারিক রূপ বিশেষভাবে
জনপ্রিয়। এটি দেবীকে কেবল অসুরবিনাশিনী শক্তির রূপেই নয়, ঘরের মেয়ের রূপেও তুলে ধরে। দেবী লক্ষ্মী ও সরস্বতী: সমৃদ্ধি ও বিদ্যার প্রতীক মা দুর্গার এক পাশে থাকেন দেবী লক্ষ্মী। হিন্দুধর্মে তিনি ধন, ঐশ্বর্য, সৌভাগ্য
ও সমৃদ্ধির প্রতীক। সংসারে সুখ-শান্তি এবং প্রাচুর্যের কামনায় লক্ষ্মীর আরাধনা করা
হয়। প্রচলিত বাঙালি প্রতিমায় লক্ষ্মীকে সাধারণত পদ্মফুলের সঙ্গে দেখা যায়। তাঁর বাহন
পেঁচা; রাতের অন্ধকারেও দেখতে পাওয়ার ক্ষমতার কারণে পেঁচাকে অনেক সময় সতর্কতা ও বিচক্ষণতার
প্রতীক হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হয়। অন্যদিকে, দেবী দুর্গার অন্য পাশে থাকেন বিদ্যা, সংগীত, শিল্প ও জ্ঞানের দেবী
সরস্বতী। শিক্ষার্থী, শিল্পী ও জ্ঞানচর্চায় যুক্ত মানুষের কাছে তাঁর বিশেষ গুরুত্ব
রয়েছে। সাধারণত সাদা পোশাকে, হাতে বীণা এবং পাশে রাজহাঁসসহ সরস্বতীর প্রতিমা দেখা যায়।
সাদা রংকে জ্ঞান, পবিত্রতা ও স্বচ্ছতার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। দুর্গাপূজার প্রতিমায়
সরস্বতীর উপস্থিতি তাই বিদ্যা ও সংস্কৃতির গুরুত্বকেও মনে করিয়ে দেয়। কার্তিক ও গণেশ: বীরত্ব, বুদ্ধি ও শুভ সূচনা মা দুর্গার সন্তানদের মধ্যে কার্তিক বা কার্তিকেয় পরিচিত যুদ্ধ ও সামরিক শক্তির
দেবতা হিসেবে। হিন্দু পুরাণে তিনি দেবসেনাপতি। বাঙালি প্রতিমায় তাঁকে সাধারণত সুদর্শন
যুবক হিসেবে দেখানো হয় এবং তাঁর বাহন ময়ূর। ময়ূরের সৌন্দর্য ও গর্বিত ভঙ্গি কার্তিকের
প্রচলিত প্রতিমার সঙ্গে বিশেষভাবে মানানসই। অন্যদিকে, গণেশকে চেনা যায় তাঁর হাতির মাথা ও বৃহৎ উদরের জন্য। তিনি বাধা দূর
করা, বুদ্ধি, সিদ্ধি ও শুভ সূচনার দেবতা হিসেবে পূজিত হন। যেকোনো নতুন কাজ শুরুর আগে
গণেশের আরাধনার রীতি প্রচলিত। বাঙালি দুর্গাপূজার প্রতিমায় তাঁর বাহন হিসেবে দেখা যায়
ছোট্ট ইঁদুরকে। আকারে ক্ষুদ্র হলেও ইঁদুরের উপস্থিতি গণেশের প্রতিমায় বিশেষ তাৎপর্য
বহন করে—শক্তি ও বুদ্ধির মাধ্যমে বাধা অতিক্রম করার ভাবনার সঙ্গে যার পরিচয় জড়িত। বাহন ও অসুরবধের প্রতীকী তাৎপর্য দুর্গাপূজার প্রতিমায় দেবদেবীদের পাশাপাশি বাহনগুলোও বিশেষভাবে নজর কাড়ে। মা
দুর্গার বাহন সিংহ, লক্ষ্মীর পেঁচা, সরস্বতীর রাজহাঁস, কার্তিকের ময়ূর এবং গণেশের ইঁদুর।
এই বাহনগুলো কেবল প্রতিমার অলংকার নয়; বরং হিন্দু ধর্মীয় কল্পনা ও প্রতীকের অংশ। পাশাপাশি, প্রচলিত বাঙালি প্রতিমায় অসুরবধের দৃশ্যও থাকে। মহিষাসুরের বিরুদ্ধে
দেবী দুর্গার যুদ্ধ অশুভ শক্তির ওপর শুভ শক্তির জয় হিসেবে বিবেচিত হয়। দেবীর পরিবারের
সদস্যদের উপস্থিতি এবং তাঁদের বাহন মিলিয়ে প্রতিমাটি হয়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ পৌরাণিক
দৃশ্য। উমার ঘরে ফেরার আবেগ বাঙালির দুর্গাপূজায় দেবী দুর্গাকে অনেক সময় ‘উমা’ বা ঘরের মেয়ে হিসেবে কল্পনা
করা হয়, যিনি কৈলাশ থেকে সন্তানদের নিয়ে মর্ত্যে আসেন। এই ভাবনায় দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয়
আচার নয়, ঘরে মেয়ের ফিরে আসার আনন্দ, পারিবারিক বন্ধন ও মিলনোৎসবের আবেগও বহন করে। সপ্তমীর পূজায় যখন মণ্ডপে দেবী দুর্গার সামনে ভক্তরা প্রণাম করেন, তখন তাঁর সঙ্গে
থাকা লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশও পূজার সামগ্রিক আবহকে পূর্ণতা দেন। সমৃদ্ধি,
বিদ্যা, সাহস ও শুভ সূচনার প্রতীক হিসেবে তাঁদের উপস্থিতি দুর্গোৎসবের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক
অর্থকে আরও গভীর করে তোলে। সূত্র-বিএসস/জাগোবিডি/বিডিফেস/ মেহেদী হাসান
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more