২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর। টাঙ্গাইল শহরের
কলেজপাড়া এলাকার ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শফিকুল হক শামীমের বাসায় ঘটে মর্মান্তিক
এক ঘটনা। ভারতীয় সিরিয়াল দেখাকে কেন্দ্র করে ২২ বছরের সুমি আক্তারকে পিটিয়ে হত্যা
করে একই বাসার ভাড়াটিয়া রীনা বেগম। টাঙ্গাইল থানা পুলিশের মারফতে জানা যায়,
ওই দিন বিকেলে কাউন্সিলর শামীমের বাসার ভাড়াটিয়া শাহজাদীর ঘরে টিভি দেখতে যায় পাশের
বাসার সুমি ও রীনা। এ সময় সুমি ও রীনার মধ্যে কোনো এক ভারতীয় সিরিয়াল নিয়ে কথাকাটাকাটি
হয়। এরই একপর্যায়ে সুমিকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে রীনা। স্থানীয়রা আহত সুমিকে টাঙ্গাইল
জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরবর্তীতে অভিযুক্ত
রীনা বেগমকে আটক করে পুলিশ।
অধ্যায় ০২ । "পাখি" ড্রেস
ও ট্র্যাজেডি
এর প্রায় আড়াই বছর আগের কথা। ২০১৪ এর
মাঝামাঝি সময়। ভারতীয় চ্যানেল স্টার জলসার তৎকালীন সময়ের জনপ্রিয় টিভি সিরিয়াল
'বোঝেনা সে বোঝেনা'র প্রধান চরিত্র পাখির পরনে থাকা এক বিশেষ ধরনের থ্রি-পিস তুমুল
জনপ্রিয়তা পায় এদেশের উদীয়মান বয়সী মেয়েদের মধ্যে। সবার মধ্যেই তখন এই বিশেষ ড্রেস
কেনার হিড়িক।
৯ জুলাই ২০১৪। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ
উপজেলার কানসাট ইউনিয়নের আব্বাস বাজার বিশ্বনাথপুর গ্রামের ১৩ বছর বয়সী কিশোরী হালিমা
খাতুন গলায় ফাঁস দেয়। কারণ, পাখি ড্রেস কিনে দিতে দেরি করেছিলেন তার বাবা। বেশ কয়েকদিন
জমে মানুষের টানাটানির পর ২২ জুলাই তার মৃত্যু হয়।
এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ২৭ জুলাই
একই কারণে আত্মহত্যা করে গাইবান্ধার কিশোরী নূরজাহান খাতুন। তার ঠিক এক সপ্তাহ আগে,
অর্থাৎ ২০ জুলাই, পাখি ড্রেস কিনে না দেওয়ায় স্বামী
মোহাম্মদ সাইদুল ইসলামকে তালাক দেয় খুলনার
পাইকগাছার গদাইপুর গ্রামের গৃহবধূ শারমিন।
অধ্যায় ০৩ । সিরিয়ালের প্রভাব ও ফর্মুলা
সন্ধ্যার আগে থেকে কোনো কিছুতেই মন বসে
না। কখন সাতটা বাজবে—সে আশায় বেশ কয়েকবার ঘড়ি দেখা হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই। বাংলার
অনেক ঘরের মেয়েদের দৈনন্দিন চিত্র এটি। ঠিক সন্ধ্যা ৭টা থেকে রাত ১১টা—এটাই আমাদের
ঘরের মা-বোনদের ভারতীয় সিরিয়াল দেখার সময়সূচি। প্রতিদিনই নতুন নতুন পর্ব, নতুন নতুন
ঘটনার মোড়—সে এক রুদ্ধশ্বাস ব্যাপার! অন্তত যারা নিয়মিত এসব সিরিয়াল দেখে, তাদের
কাছে।
নেশা না হয়ে যাবে কোথায়? একদিন দেখতে
না পারলেই মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। কারো কাছ থেকে ঘটনা শুনে নিতে না পারলে বা পুনঃপ্রচার
দেখতে না পারলে উশখুশ করে মন। হ্যাঁ, ভারতীয় সিরিয়ালের এমন ভয়ঙ্কর নেশায় মত্ত হয়ে
আছে বাংলাদেশের অসংখ্য নারী। স্টার প্লাস, স্টার জলসা কিংবা জি টিভিতে চলা এই সিরিয়ালগুলো
নারীদের মধ্যে তুমুল জনপ্রিয়। অনেক পুরুষও আজকাল ঝুঁকছেন এসবের দিকে। কিন্তু এহেন
আসক্তি কি ভালো কিছু বয়ে আনছে? মোটেই না।
চলুন ভারতীয় সিরিয়ালগুলোর একটা সাধারণ
ময়নাতদন্ত সেরে আসা যাক। হিন্দি হোক বা বাংলা, ভারতীয় টিভি সিরিয়াল মানেই তাতে মোটামুটি
দুটো পক্ষ থাকবে। এক পক্ষ ভালো, অন্য পক্ষ খারাপ। ভালোর সংখ্যাই বেশি সাধারণত। কিন্তু
এই দলের লোকেরা শুধু ভালোই নন, বেশিরভাগই হবেন নেহায়েত গোবেচারা টাইপের। সাত চড়েও
রা কাটে না। আর খারাপের দলের প্রধান সাধারণত একজন কূটবুদ্ধিসম্পন্ন মহিলা। অন্যদের
পেছনে লেগে থাকা ছাড়া যার দুনিয়ায় আর কোনো কাজই নেই।
তো আমাদের বদ গ্রুপ বিভিন্ন কূটকৌশল খাটিয়ে
সংসারে অশান্তির সৃষ্টি করবে, গোবেচারা টাইপ মানুষগুলোর ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। সিরিয়ালের
প্রধান চরিত্রও থাকবেন এই গোবেচারাদের দলে। ইনিও সাধারণত মহিলা। তবে এনার মতো সতী-সাধ্বী
জগৎ সংসারে আর একটাও পাবেন না আপনি। সকল কূটকৌশল, অপমান তিনি মুখ বুজে সহ্য করবেন।
এর মধ্যে পর্বের পর পর্ব আগাতে থাকবে।
নতুন নতুন কূটকৌশল দেখবেন, ছলচাতুরী দেখবেন, পরকীয়া দেখবেন, মিথ্যা অপবাদ দেখবেন,
চুরি-চামারি দেখবেন, ডিভোর্স দেখবেন, মিথ্যে সন্দেহ দেখবেন, ধর্ষণ দেখবেন, বহুবিবাহ
দেখবেন।
কুসংস্কার দেখবেন, সায়েন্সের সমস্ত ল-কে
বুড়ো আঙুল দেখানো আজগুবি সব ঘটনাও দেখবেন। হত্যার প্রচেষ্টাও দেখবেন। মানে যত প্রকার
নেগেটিভ কনসেপ্ট মাথায় আসা সম্ভব, সবই দেখবেন ঘুরেফিরে। তবে সবচেয়ে বেশি পাবেন স্লো-মোশন
দৃশ্য, বজ্রপাতের আওয়াজ আর সামান্য একটু কাহিনীকে ঘুরিয়ে-পঁচিয়ে রাবারের মতো টেনে
লম্বা বানিয়ে পর্বের পর পর্ব চালানো। মোটামুটি এই হলো ভারতীয় সিরিয়ালের নাড়ি-নক্ষত্রের
সারাংশ।
অধ্যায় ০৪। সিরিয়ালের কুফল ও মনস্তাত্ত্বিক
ক্ষতি
আপনি যদি ভারতীয় সিরিয়াল লাভার হন,
এতক্ষণে আমাদের পিণ্ডি চটকানো শুরু করেছেন নিশ্চয়ই। তা আপনি করতেই পারেন। তো যা বলছিলাম, ভারতীয় সিরিয়ালের সারাংশ তো পেলাম।
কিন্তু শুরুতে যা বলা হলো—এর আসক্তি সমাজের জন্য ভালো কিছু বয়ে আনছে না, সেটা কীভাবে?
চলুন সেদিকেই আগানো যাক।
দেখুন, এসব সিরিয়ালগুলোকে মোটামুটি সংসারে
অশান্তি কীভাবে সৃষ্টি করা যায়, তার ভিডিও টিউটোরিয়াল বলা যেতে পারে। বিভিন্ন কূটবুদ্ধির
আশ্রয় নিয়ে প্রেমিকের সাথে প্রেমিকার, স্বামীর সাথে স্ত্রীর, বাবা-মায়ের সাথে ছেলের,
ভাইয়ের সাথে বোনের সম্পর্ক নষ্ট করার ঘটনা নেই—এমন সিরিয়াল খুঁজে পাওয়ার আশা করাই
বৃথা।
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক গভর্নর কেশরী নাথ
ত্রিপাঠী কী বলেছেন শুনুন। এক সভায় তিনি বলেন, "দুর্ভাগ্যের বিষয় কিছু চ্যানেলে
এমন কিছু সিরিয়াল প্রচারিত হচ্ছে, যেখানে সংসারের নানা অশান্তি, ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র,
পরিবারের সদস্যদের মাঝে ঝগড়াসহ নানান বিষয় তুলে ধরা হয়।"
হ্যাঁ, সিরিয়ালগুলোর মুখ্য উপজীব্যই
অমুক-তমুকের প্রতিহিংসা, প্রতিযোগিতা, প্রতিশোধপরায়ণতা। আর এসবের নেতিবাচক প্রতিফলন
ঘটে দর্শকের পারিবারিক ও সংসার জীবনে। টিভির পর্দায় নায়ক-নায়িকার সম্পর্ক দেখে অহেতুক
ফ্যান্টাসিতে ভুগে নিজের সঙ্গী আর সম্পর্ক নিয়ে হতাশ হয়ে পড়ে আছে অনেকেই। সেই সাথে
সম্পর্কের মধ্যে অনেক তুচ্ছ ঘটনাকে ঘুরিয়ে-পঁচিয়ে জটিল করে দেখানো হয় প্রায়ই; যার
প্রভাব পড়ে দর্শকের ব্যক্তিগত জীবনে। সহজ ব্যাপারগুলোকে সহজভাবে নেয়াটাই ভুলে যায়
অনেকে। বাড়ে মানসিক চাপ, বাড়ে অশান্তি।
হয়ত ভাবছেন, মানুষ এত বোকা না। হ্যাঁ,
সবার অবস্থা এমন হয় না অবশ্য। কিন্তু একটা কথা মনে রাখাই দরকার, এসব সিরিয়ালের দর্শকের
একটা বড় অংশ উঠতি বয়সী মেয়েরা, যাদের মানসিক পরিপক্কতা এখনো আসেনি। তার উপর বেশিরভাগ
সিরিয়ালে ঘরের বউকে দেখানো হয় সর্বংসহা হিসেবে। এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন সব
অন্যায়-অনাচার যে মুখ বুজে সহ্য করবে—সেই লক্ষ্মী বউ। কী ভয়ঙ্কর ব্যাপার, বুঝতে পারছেন?
পরকীয়া তো খুবই সাধারণ ব্যাপার আজকালকার
সিরিয়ালগুলোতে। টিভির পর্দায় এসব পরকীয়ার দৃশ্য দেখার ফল যে কতটা ভয়াবহ, তা অনেকেরই
চিন্তার বাইরে। প্রথম ক্ষতিটা হয় নরমালাইজেশনের ফলে। ধরুন, আপনি প্রতিনিয়ত আপনার
চারপাশের মানুষদের মদ খেতে দেখেন। আপনি যদিও জানেন মদ খাওয়া ভালো নয়, তবুও একটা সময়
পর আপনার অবচেতন মন মদ খাওয়ার ব্যাপারে সায় দেবে। কারণ, দেখতে দেখতে এ কাজটাকে সাধারণ
ব্যাপার বানিয়ে ফেলেছেন আপনি। এমনটা পরকীয়ার বেলাতেও ঘটে।
ধরুন, আপনার কোনো পছন্দের সিরিয়ালের
পছন্দের চরিত্র—নায়ক হতে পারে, নায়িকা হতে পারে বা অন্য কেউ হতে পারে—হয়ত তার আকর্ষণের
কারণেই আপনি সিরিয়ালটা দেখেন। তো একপর্যায়ে দেখা গেল, ওই চরিত্রটি পরকীয়ায় জড়িয়ে
পড়েছে। এখন যেহেতু পছন্দের ওই চরিত্রটির একটি প্রভাব আপনার অবচেতন মনের উপর আছে, দেখা
যাবে তার পরকীয়া করার ব্যাপারটিকেও তখন আপনি হয়ত স্বাভাবিকভাবেই কিংবা ভালোলাগা নিয়েই
দেখছেন। ফলে আপনার বাস্তব জীবনেও যদি কখনো এরকম পরিস্থিতি আসে, আপনি হয়ত নিজেকে তার
জায়গায় বসিয়ে ভাববেন। আপনার হয়ত মনেই থাকবে না যে আপনি একটা অভিনয় দেখেছিলেন।
না, কল্পনাপ্রসূত কথা নয় এটি। যারা হিউম্যান
সাইকোলজি নিয়ে ঘাটাঘাটি করেন, সুযোগ থাকলে তাদের সাথে আলাপ করে দেখুন। বুঝতে পারবেন
মানুষের আচরণ মিডিয়া থেকে কতখানি প্রভাবিত হতে পারে। সেই সাথে টিভির পর্দায় প্রতিনিয়ত
পরকীয়া, সঙ্গীর সাথে প্রতারণা—এসব ক্রমাগত দেখতে থাকলে তখন নিজের সঙ্গীর উপর অহেতুক
সন্দেহ জন্মানো খুবই সাধারণ ব্যাপার। সন্দেহ থেকে অশান্তি, ঝগড়া-বিবাদ—এমনকি তা বিবাহবিচ্ছেদেও
গড়াতে পারে।
অধ্যায় ০৫ । সংস্কৃতি ও সচেতনতার আহ্বান
দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, ভারতীয় সংস্কৃতির
অবাধ চর্চা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে এদেশে। আর তার পেছনে টিভি সিরিয়ালগুলোই অনেকাংশেই
দায়ী। সিরিয়ালে দৃশ্যমান বিজাতীয় সংস্কৃতিকে অবচেতনভাবেই আত্মীকরণ করছি আমরা। কুসংস্কার,
ইতিহাস বিকৃতি, অবাস্তব ঘটনা—এগুলোর দৃশ্যায়ন চলছে দেদারসে। অদূর ভবিষ্যতে হয়ত আমরা
এর প্রভাব ব্যাপক হারে দেখতে পাব আমাদের সমাজে।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে সিরিয়াল দেখার নেশা
এতটাই তীব্র হয়ে উঠেছে যে—নাওয়া, খাওয়া, সংসার কোনো কিছুরই খবর থাকছে না। সন্তান
পড়ছে কি না বা কী করছে—সে খোঁজও থাকছে না। সিরিয়াল দেখা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে
ঝগড়া-বিবাদের ঘটনাও বিরল নয়। এতসব নেতিবাচক দিক বিবেচনা করেই বাংলাদেশে স্টার প্লাস,
স্টার জলসা, জি বাংলা ইত্যাদি চ্যানেলের সম্প্রচার নিষিদ্ধের দাবি উঠেছে বারংবার। কিন্তু
কোনো এক অজানা কারণে এখনো সে দাবি বাস্তবায়ন হয়নি।
তাই সর্বস্তরে ব্যাপক হারে সচেতনতা সৃষ্টি—এসব
সিরিয়ালের ভয়াল ছোবল থেকে নিস্তারের একমাত্র পন্থা।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more