প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুন ২০, ২০২৬, ১:৫৩ পি.এম
'ডিপ স্টেট' বা ছায়া সরকার আসলে কি?
অ-অ+
বিশেষ প্রতিবেদন: সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনের পর থেকে বৈশ্বিক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত শব্দবন্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে—'ডিপ স্টেট' বা ছায়া সরকার। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সমান্তরালে বা তাদের আড়ালে থেকে রাষ্ট্রের এমন এক অদৃশ্য শক্তি নীতি নির্ধারণকে প্রভাবিত করছে, যা নিয়ে খোদ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকেই তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্র পরিচালনায় মূলত দুটি শক্তি কাজ করে। একটি হলো জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাজনৈতিক নেতৃত্ব (যেমন: রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য); অন্যটি হলো রাষ্ট্রের স্থায়ী প্রশাসনিক কাঠামো (যেমন: আমলাতন্ত্র, সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও বিচার বিভাগ)। নির্বাচিত সরকারগুলো নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে পরিবর্তিত হলেও, স্থায়ী কাঠামোর কর্মকর্তারা অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত নিজ নিজ পদে বহাল থাকেন। ডিপ স্টেট তত্ত্ব অনুযায়ী, এই স্থায়ী কাঠামোরই কিছু শক্তিশালী ও প্রভাবশালী গোষ্ঠী যখন নির্বাচিত সরকারের আওতার বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ গোপনে নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে, তখনই তাকে 'ডিপ স্টেট' বলা হয়। বিশ্ব রাজনীতিতে ডিপ স্টেটের ইতিহাস ডিপ স্টেট শব্দটির প্রথম উত্থান ঘটে ১৯৯০-এর দশকে তুরস্কের রাজনীতিতে। সে সময় অভিযোগ ওঠে যে, দেশটির নির্বাচিত সরকারের বাইরেও সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি প্রভাবশালী চক্র গোপনে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ করত। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই শব্দটি নতুন করে তুমুল জনপ্রিয়তা পায়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে বারবার অভিযোগ করেন যে, তার প্রশাসনের ভেতরে থাকা কিছু স্থায়ী আমলা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা বা ‘ওয়াশিংটন এস্টাবলিশমেন্ট’
তার প্রকাশ্য নীতিগুলোর বিরুদ্ধে গোপনে অবস্থান নিয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও আমলাতন্ত্রের ওপর ক্ষোভ বাংলাদেশের রাজনীতিতেও এই অদৃশ্য শক্তির উপস্থিতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। সম্প্রতি সরকারের অন্তর্র্বতীকালীন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফয়জুল কবির খানের একটি বক্তব্যে এই ক্ষোভের চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটে। নিজ নিজেও একজন সাবেক সচিব হওয়া সত্ত্বেও আমলাদের কর্মকাণ্ড ও মানসিকতার কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, "আমলাতন্ত্র একটি জগদ্দল পাথরের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা জনগণের বুকের ওপর চেপে বসে আছে এবং এখানে সহজে কোনো পরিবর্তন আনা যায় না।" তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নিয়ে এই আমলাতান্ত্রিক মহলের কোনো মাথাব্যথা নেই; তারা কেবল নিজেদের সুযোগ-সুবিধা, পে-স্কেল এবং দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলো বাড়াতেই ব্যস্ত। এমনকি আমলাতন্ত্রের প্রতি জনগণের তীব্র ক্ষোভের উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি একটি ভয়াবহ মন্তব্যের উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছিল—উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুলের ওপর যে মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল, সেটি স্কুলের ওপর না পড়ে যদি বাংলাদেশ সচিবালয়ের ওপর পড়ত, তবে হয়তো এই জগদ্দল পাথর থেকে দেশ মুক্ত হতো। যেভাবে কাজ করে এই চক্র গবেষকদের মতে, ডিপ স্টেট মূলত রাষ্ট্রের অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে প্রভাব বিস্তার করে। এর মধ্যে রয়েছে—গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণ, জাতীয় অর্থনীতি ও বাজার নিয়ন্ত্রণ, যেকোনো বড় ধরনের রাষ্ট্রীয় সংস্কার বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করা এবং নির্বাচন ব্যবস্থা বা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মতো স্পর্শকাতর বিষয়াবলি। নিজেদের ক্ষমতা ও সুযোগ-সুবিধার সর্বোচ্চ অপব্যবহার নিশ্চিত করার স্বার্থেই এই চক্রটি সবসময় রাষ্ট্রক্ষমতায় একটি দুর্বল, দুর্নীতিগ্রস্ত বা তাদের ওপর নির্ভরশীল সরকারকে টিকিয়ে রাখতে পছন্দ করে। বাস্তব নাকি রাজনৈতিক অজুহাত? তবে ‘ডিপ স্টেট’ পুরোপুরি একটি বাস্তবতা নাকি শুধুই রাজনৈতিক ঢাল—তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ক্ষমতাসীন সরকারগুলো প্রায়শই নিজেদের ব্যর্থতা, অর্থনৈতিক সংকট বা ভুল নীতির দায় এড়াতে এই ‘অদৃশ্য শত্রু’ বা ডিপ স্টেটের তত্ত্ব সামনে নিয়ে আসে। যেহেতু এই গোষ্ঠীগুলো সম্পূর্ণ গোপনে এবং পর্দার আড়াল থেকে কাজ করে, তাই তাদের কর্মকাণ্ডের সরাসরি কোনো প্রমাণ বা আইনি নথি পাওয়া যায় না। এই অস্পষ্টতার কারণেই একাংশের গবেষক ও সাধারণ মানুষ ডিপ স্টেট ধারণাকে স্রেফ একটি মনগড়া 'ষড়যন্ত্র তত্ত্ব' হিসেবেও উড়িয়ে দেন। তবুও, আমলাতান্ত্রিক অনমনীয়তা এবং দৃশ্যমান জনমতের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্রের স্থায়ী কাঠামোগুলোর সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা প্রমাণ করে যে, ব্যালট পেপারের বাইরেও ক্ষমতার এমন কিছু গোপন অলিন্দ রয়েছে, যা আধুনিক গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more