আল আমীন আকন, বাউফল থেকে-
পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে রেখে পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার কামারপাড়াগুলোতে বেড়েছে কর্মব্যস্ততা। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত আগুনে পুড়িয়ে লোহা পেটানোর শব্দে মুখর হয়ে উঠেছে কামারশালাগুলো। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দা, ছুরি, বটি, কুড়ালসহ বিভিন্ন ধারালো সরঞ্জাম তৈরিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন কামাররা।
ঈদের মৌসুমকে ঘিরেই বছরের সবচেয়ে বড় আয়ের সুযোগ পান এ পেশার মানুষরা। কেউ নতুন সরঞ্জাম তৈরি করছেন, আবার কেউ পুরোনো জিনিসে শান দিচ্ছেন। কাজের চাপ এতটাই বেশি যে অনেক সময় খাওয়া-দাওয়ারও সুযোগ মেলে না। তবুও এই ব্যস্ততাই তাদের মুখে এনে দেয় স্বস্তির হাসি।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, একসময় গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল কামার শিল্প। কৃষিকাজের লাঙল, কোদাল, কাস্তে থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা সরঞ্জাম তৈরি হতো কামারদের হাতেই। তখন এ পেশায় ছিল সম্মান ও আর্থিক স্থিতি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে।
কারখানায় তৈরি আধুনিক যন্ত্রপাতি, বিদেশি পণ্যের সহজলভ্যতা ও কম দামের কারণে স্থানীয়ভাবে তৈরি লোহার সামগ্রীর চাহিদা কমে গেছে। ফলে বছরের অধিকাংশ সময়ই অনেক কামারশালায় কাজ থাকে না। জীবিকার তাগিদে কেউ দিনমজুরি, কেউ রিকশাচালনা কিংবা অন্য পেশায় যুক্ত হলেও অনেকে এখনো ধরে রেখেছেন পূর্বপুরুষের এই ঐতিহ্যবাহী পেশা।
উপজেলার গোলাবাড়ি এলাকার কমল কর্মকার বলেন, “সারা বছর কাজ কম থাকে। সংসার চালাতে কষ্ট হয়। কিন্তু ঈদ এলেই কিছু কাজ পাই। তখন মনে হয়, এখনো এই পেশাটা বেঁচে আছে।”
ঈদের মৌসুমে কামার পরিবারের নারী ও শিশুরাও বিভিন্নভাবে কাজে সহায়তা করেন। কেউ কয়লা সরবরাহ করেন, কেউ প্রস্তুত সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখেন। পুরো পরিবার মিলে যেন দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যায়।
তবে ঈদের এই ব্যস্ততা ক্ষণস্থায়ী। মৌসুম শেষ হলেই আবারও নেমে আসে কাজের সংকট ও অনিশ্চয়তা। অনেক পরিবার তখন দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতেই হিমশিম খায়।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে ঐতিহ্যবাহী এ শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। অন্যথায় সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে শতবর্ষী কামার শিল্প।