প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুন ২২, ২০২৬, ১:৩০ পি.এম
অনলাইনে আপনি কতটা নিরাপদ?
অ-অ+
ডেটা ব্রোকার- আপনার প্রাইভেসি বিক্রি করে গড়ে ওঠা মিলিয়ন
ডলারের ব্যবস্যা: প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে সময়, বদলাচ্ছে পৃথিবী।
সেই সাথে বদলাচ্ছে আমাদের নানাবিধ কাজের ধরন। একটা সময় ছিল যখন কোনো কিছু কিনতে দোকানে
বা বাজারে যেতে হতো, এখন আর তা না করলেও চলে। অনলাইনে অর্ডার করে দিন, কাঙ্ক্ষিত পণ্যটি
পৌঁছে যাবে আপনার দোরগোড়ায়। নিউজ পড়া বা শোনা দরকার? অনলাইন পোর্টাল দেখুন কিংবা
ইউটিউব এর মতো প্লাটফর্মে খুঁজুন। ফিট থাকতে চান? রয়েছে ফিটনেস অ্যাপ। স্টক বেচাকেনা
করতে চান? অনলাইন অ্যাপ তো রয়েছেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় স্ক্রলিং করতে গিয়ে কিছু একটা
ভালো লাগলো? লাইক দিন, শেয়ার দিন, কমেন্ট করুন। কিছু ভালো লাগলো না? তার জন্য রয়েছে
যথাযথ রিঅ্যাক্ট এর ব্যবস্থা। রয়েছে টুইটারে গিয়ে আপনার অসন্তোষের কথা গোটা দুনিয়াকে
জানিয়ে দেওয়ার সুযোগ। নতুন রিলেশন হয়েছে? রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস চেঞ্জ করুন।এভাবে
যেন হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্টফোনটির মধ্যেই ঢুকে গেছে আমাদের গোটা জীবন। না, স্মার্টফোনের
কুফলের আলাপচারিতায় আজ আমরা যাব না। আজকের কথাবার্তা হবে ডেটা চুরি নিয়ে। একটু খেয়াল
করুন তো—এই যে আমাদের জীবনের একটা সুবিশাল অংশ অনলাইন নির্ভর হয়ে পড়ল, তার সুফল ভোগ
করতে গিয়ে কত জায়গায় কত পার্সোনাল ইনফরমেশন শেয়ার করেছেন বা করছেন প্রতিদিন? এই
যে আপনার-আমার হাজারো পার্সোনাল ইনফরমেশন জমে আছে নাম না জানা কত প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে,
এই যে আপনার ব্যক্তিগত বিভিন্ন তথ্যের অ্যাক্সেস পেয়ে যাচ্ছে সম্পূর্ণ অজানা-অচেনা
একদল মানুষ, এই যে মানুষের পার্সোনাল ডেটাকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে বিলিয়ন ডলারের
ইন্ডাস্ট্রি, তার কতটুকু খোঁজ রাখি আমরা?ডেটা পয়েন্ট কী এবং এর মূল্যআপনার নাম, বয়স,
হাইট, ওয়েট, বাসস্থান, কর্মক্ষেত্র, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, পছন্দ-অপছন্দ, ফোন নম্বর,
ইমেইল, শারীরিক অবস্থা, ক্রয়ক্ষমতা, রাজনৈতিক মতাদর্শ, ধর্মীয় বিশ্বাস, আপনি কাকে
টেক্সট বা কল দিচ্ছেন, কোন কোন রেস্টুরেন্টে খেতে যাচ্ছেন, কোন সুপারমার্কেট থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয়
জিনিস কেনেন—এমন হাজারো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইনফরমেশনকে বলা হয় ডেটা পয়েন্ট। আর এই ডেটা
পয়েন্টগুলো খুবই মূল্যবান।কেন? আপনার-আমার মতো ছাপোষা মানুষের এত খুঁটিনাটি জানার
আগ্রহ কার? বিজ্ঞাপনদাতারা এর একটা ভালো উদাহরণ হতে পারে। এত সব ডেটা কালেক্ট করে তারা
সহজেই বুঝতে পারে তাদের পণ্যের সম্ভাব্য কাস্টমার কারা, কাদেরকে টার্গেট করে মার্কেটিং
চালাবে তারা। ও আচ্ছা, এই ব্যাপার! কিন্তু এত শত ডেটা তো আর আমি কাউকে একবারে দিই না?
হ্যাঁ, তা কেউই দেয় না। কিন্তু নিশ্চিত থাকুন, আপনার খুঁটিনাটি সব ডেটাই ইতিমধ্যে
জমা হয়ে আছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বিভিন্ন সার্ভারে।ডেটা ব্রোকার ও বিলিয়ন ডলারের
শিল্পআপনার ব্যক্তিগত তথ্যাদি ডলারে দরদাম করে বেচাকেনা চলছে প্রতিনিয়ত। ২০০ বিলিয়ন
ডলারের এই সুবিশাল ইন্ডাস্ট্রি গড়ে উঠেছে এই ডেটার ব্যবসাকে ঘিরে। সোজা কথায়, আপনার
ডেটা আর আপনার নেই। এখন হয়তো গুগল, ফেসবুক, অ্যামাজনের মতো টেক জায়ান্টগুলোর কথা
আপনার মাথায় আসছে। না, যতদূর জানা যায়, তারা আর যাই করুক আপনার-আমার ডেটা বিক্রি
করে না কোথাও। বলছি এমন সব ছোট ছোট কোম্পানির কথা, যাদের নাম হয়তো আপনি কোনোদিনও শোনেননি
আর শুনবেনও না। এমন সব কোম্পানি যারা পুরোপুরি ডেটা ব্রোকার বা তথ্য বেচাকেনার সাথে
জড়িত। আর এদের সংখ্যা কিন্তু নেহাত কম নয়, শুধুমাত্র আমেরিকাতেই এমন প্রতিষ্ঠান রয়েছে
৪,০০০-এরও বেশি। যারা সবার অজান্তেই সাধারণ মানুষের ডেটা সংগ্রহ করছে, বাছাই করছে আর
বিক্রি করছে চড়া দামে।যেভাবে ডেটা সংগ্রহ করা হয়এখন ধরুন, আমি সাধারণ মানুষের ডেটা
হাতিয়ে তা দিয়ে বিজনেস করতে চাই। তো তার জন্য ডেটা তো কালেক্ট করা লাগবে, নাকি? খুব
কঠিন কাজ মনে হচ্ছে? মোটেই না। প্রতিনিয়ত স্বেচ্ছায় আমাদের পার্সোনাল বিভিন্ন ইনফরমেশন
আমরা শেয়ার করি অনলাইন দুনিয়ায়। কখনো মাথায়ও আনি না এসব ডেটা দিয়ে কেউ ব্যবসা
করতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়ার কথাই চিন্তা করুন না—ব্যক্তিগত জীবনের কত কিছুই পাবলিকলি
শেয়ার করি সেখানে। আপনি কি কি পেজে লাইক দিয়েছেন, কোথায় কোথায় চেক-ইন দিয়েছেন,
রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস, শখ, ফ্রেন্ড লিস্ট—আরও কত কিছু জানা যেতে পারে সোশ্যাল মিডিয়া
ঘাটলে।আর শুধু কি সোশ্যাল মিডিয়া? কল রেকর্ড, জন্ম নিবন্ধন, ভোটার আইডি কার্ডের তথ্য,
ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য, জমির রেজিস্ট্রি—কী? যা ভাবছেন তাই, সবই বিক্রয়যোগ্য। এমনকি
অনেক প্রতিষ্ঠান আছে যারা তাদের পণ্য বা সেবা বিক্রির মাধ্যমে যতটা আয় করে, তার চাইতেও
বেশি আয় হয় ক্রেতার পার্সোনাল ইনফরমেশন ভিন্ন কারও কাছে বিক্রির মাধ্যমে। চিন্তা
করতে পারেন কি?ইন্টারনেটে এমন হাজারো সাইট আছে যেগুলো দেখলে খুবই সাধারণ বা ফানি সাইট
বলে মনে হবে, কিন্তু সেগুলোর কাজই হলো ভিজিটরদের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন তথ্য হাতিয়ে
নেওয়া। ওয়েবসাইটে বিভিন্ন ট্র্যাকার বসিয়ে আপনার লোকেশন, কন্টাক্ট লিস্টের তথ্য
জোগাড় করা খুবই আহামরি কঠিন কিছুই নয়। অনেক ওয়েবসাইটে ঢুকলে দেখবেন 'কুকি এক্সেপ্ট'
করতে বলছে, নামটা তো গালভরা, কাজটা কি এর? অনেক ক্ষেত্রেই এই কুকির মাধ্যমে আপনার অনলাইন
কার্যক্রম ট্র্যাকিং করা হয়। কোন কোন ওয়েবসাইট আপনি ভিজিট করলেন, কোন নিউজ আপনি পড়লেন,
কোন পণ্য আপনি কিনলেন অনলাইন থেকে—সবই ট্র্যাক করা সম্ভব।এগুলো কি আইনগতভাবে বৈধ? অবশ্যই।
আপনি তো শুরুতেই 'আই এগ্রি' বাটনে ক্লিক করে বসে আছেন কোনো কিছু না পড়েই। সম্মতি তো
দিয়েই দিয়েছেন। টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনস এর বক্সে টিক চিহ্ন কে দিয়েছে? আপনিই তো।
বৈধ হবে না কেন? আপনিই তো আপনার পার্সোনাল ডেটা স্বেচ্ছায় শেয়ার করছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়।
অবৈধ হবার কোনো সুযোগ আপনি তো রাখেননি। যাই হোক, ডেটা কালেক্ট করা যে কোনো ব্যাপারই
না, তা আশা করি পরিষ্কার। এভাবে যত ডেটা সংগ্রহ করা যাবে, পরবর্তী ধাপের দিকে ততই এগোনো
যাবে।কাস্টমার প্রোফাইল তৈরিসেটা কী? দেখুন, বিচ্ছিন্ন ডেটা কোনো কাজে আসবে না। এসব
ডেটাকে এমনভাবে গোছাতে হবে যেন তা দেখে মানুষের ব্যক্তিগত জীবন পড়ে ফেলা যায়। প্রতিটা
টার্গেটেড ব্যক্তির একটা করে প্রোফাইল বানানো হয়। সেই প্রোফাইলে থাকবে তার যাবতীয়
তথ্যাদি—যতটুক হাতানো গিয়েছে আর কি। এই প্রোফাইল দেখে আপনার-আমার পার্সোনালিটি, আচরণ,
মানসিক অবস্থা—সবকিছুই বের করে ফেলা সম্ভব।আপনার ফেসবুক অ্যাক্টিভিটি মনিটর করে আপনার
রাজনৈতিক মতাদর্শ বা ধর্মীয় বিশ্বাস জেনে নেওয়া সম্ভব। অনলাইনে আপনার কেনাকাটার হিস্টোরি
চেক করে জানা সম্ভব আপনার বয়স কত, আপনি ওয়েট গেইন করছেন নাকি হারাচ্ছেন, আপনি বিবাহিত
নাকি অবিবাহিত। কোন কোন জায়গায় আপনি বেশি যাচ্ছেন তার তথ্য পর্যালোচনা করে বের করা
যায় আপনি কোথায় থাকেন, কোথায় কাজ করেন, কোন রেস্টুরেন্টে খেতে পছন্দ করেন। আপনার
কন্টাক্ট লিস্ট বা কল লিস্ট দেখে বের করা সম্ভব আপনার পরিবারের সদস্য কারা, বন্ধু-বান্ধব
কারা, তাদের সাথে আপনার ঘনিষ্ঠতা কতটুকু। আপনার ব্রাউজিং হিস্টোরি থেকে জানা সম্ভব
কোন কোন জিনিস বা সেক্টরে আপনি বেশি আগ্রহী, আপনার ভ্রমণ পরিকল্পনা কি, কোন জিনিসটি
আপনি ভবিষ্যতে কিনতে চাচ্ছেন—এমন আরও অনেক কিছুই। আর এত শত ডেটা এক জায়গায় করা গেলে,
তা থেকে আপনার আরও অনেক আচরণ বা অভ্যাস আন্দাজ করে ফেলা কি কঠিন কিছু? এই সবকিছুই থাকে
আপনার সেই প্রোফাইলে, যা দেখে বোঝাই যায় আপনি মানুষ হিসেবে কেমন, কীভাবে চিন্তা করেন,
আপনার আচরণ কেমন হতে পারে। এই প্রোফাইল ডেটা বিজনেসের মূল প্রোডাক্ট। প্রোডাক্ট রেডি?
চলুন, বিক্রি করে আসি।ডেটার ক্রেতা কারা?কিনবে কারা? প্রথম টার্গেট মার্কেটিং কোম্পানিগুলো।
আমার কাছে যদি এমন কিছু লোকের তালিকা থাকে যারা বেশ স্বাস্থ্যসচেতন, এই তালিকা বেচেই
আমি টাকা কামাতে পারি। বিভিন্ন নামকরা জিম, পার্সোনাল ট্রেইনার, হেলথ বেসড রেস্টুরেন্ট,
ডায়েটিশিয়ান, অনলাইন বিভিন্ন ফিটনেস প্রোগ্রাম—এদের তো এমন তালিকাই দরকার। যত বেশি
টার্গেট করার মতো লোক পাবে তারা, সে অনুযায়ী মার্কেটিং ক্যাম্পেইন চালালে তাদের পণ্য
বা সেবা বিক্রি হবার সম্ভাবনা ততই বেশি।শুধু কি এরা? আপনার স্বাস্থ্যগত অভ্যাস থেকে
ধারণা নিয়ে আপনাকে টার্গেট করতে পারে হেলথ বা লাইফ ইন্সুরেন্স প্রতিষ্ঠানগুলো। ব্যাংকগুলোও
চায় আপনার ইনফরমেশন। আপনার ইতিমধ্যে ক্রেডিট কার্ড আছে কিনা, ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার
করে হুটহাট দামি জিনিস কিনে ফেলার প্রবণতা আছে কিনা—এসব দেখে ব্যাংক সিদ্ধান্ত নিতে
পারে আপনাকে কত পার্সেন্ট ইন্টারেস্টে লোন দেওয়া যেতে পারে। আর সরকার? থাক, সেদিকে
আর নাই বা গেলাম। এমন অনেক কোম্পানি আছে যারা আপনার তথ্য যাতে অন্য কারও হাতে না পড়ে
তা মনিটরিং করে দেবে অর্থের বিনিময়ে। হ্যাঁ, আপনার নিজের ডেটা নিজের কাছে রাখার জন্যও
বাইরের লোকদের টাকা দিতে হবে। অদ্ভুত শোনালেও ব্যাপারটা এমনই, কারণ আপনার ডেটা তো আর
আপনার থাকছে না।ভালো ও মন্দ দিকভিডিওর শুরু থেকেই হয়তো একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে
আপনার মাথায়—কিছুই কি করার নেই? বা আসলেই এই নিয়ে মাথা ব্যথা করা উচিত কিনা? দেখুন,
মোটামুটি সবার ডেটারই একই হাল, বেচাকেনা চলছে দেদারসে। কাজেই একদিক দিয়ে চিন্তা করলে
এ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কাজ নেই। ‘You have nothing to hide, therefore nothing to fear' আপনার পার্সোনাল ইনফো দিয়ে ব্যবসা চলছে বলেই এত এত
অনলাইন অ্যাপ আর সার্ভিস ফ্রিতে পাচ্ছেন আপনি। এমন অনেক প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপন নিউজফিডে
আসছে যেগুলো আসলেই আপনার দরকার।শুধু কি তাই? এসব ডেটা ব্যবহার করে অপরাধী শনাক্ত করা
সম্ভব। রোগ, শোক, মহামারি সম্পর্কে ভবিষ্যৎবাণী করা সম্ভব। এসব মোকাবিলায় প্রয়োজনীয়
পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব। বিভিন্ন কোম্পানি এসব ডেটা বিশ্লেষণ করে তাদের পণ্য বা সেবার
মান উন্নত করতে পারে, গ্রাহকের চাহিদা সুলভ করতে পারে। এসব তো আর খারাপ কিছু নয়। কিন্তু
যদি আপনার পার্সোনাল ডেটা অসাধু কারও হাতে চলে যায়? আপনার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে
ব্ল্যাকমেইল শুরু করে অজানা-অচেনা কেউ? কী হবে তখন?
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more