এপস্টিন ফাইলস: ক্ষমতা, কেলেঙ্কারি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নেপথ্য অধ্যায়
Date: 2026-08-08
প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: আগস্ট ০৮, ২০২৬, ৫:৪৫ এ.এম
এপস্টিন ফাইলস: ক্ষমতা, কেলেঙ্কারি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নেপথ্য অধ্যায়
অ-অ+
বিডিফেসের বিশেষ আয়োজন:
মার্কিন ধনকুবের ও বিনিয়োগকারী জেফ্রি এপস্টিনকে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ যৌন হেনস্তাকারী হিসেবে গণ্য করা হয়। একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে রাজপরিবারের সদস্য, বিলিয়নিয়ার ব্যবসায়ী এবং পপ তারকা পর্যন্ত বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি এপস্টিনের গ্রাহক তালিকায় যুক্ত ছিলেন। এপস্টিনের নথিপত্রে নাম থাকা এসব ব্যক্তির তথ্য 'এপস্টিন ফাইলস' নামে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, জেফ্রি এপস্টিন ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের হয়ে আমেরিকার রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের 'হানি ট্র্যাপ' বা যৌন ফাঁদে ফেলতেন। পরবর্তীতে তাদের ব্ল্যাকমেইল করে ইসরায়েলের স্বার্থে কাজ করানো হতো। জেফ্রি এপস্টিন আসলে কে ছিলেন এবং তার রহস্যময় অন্তর্ধান কেন আমেরিকার রাজনৈতিক অঙ্গনে তুমুল সমালোচনার জন্ম দিয়েছে—তা নিয়ে বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে বিডিফেসের এই প্রতিবেদনে।
জেফ্রি এপস্টিন ১৯৭০-এর দশকে একটি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তবে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে বিনিয়োগ ব্যাংকিং খাতে প্রবেশ করেন। প্রথমে ব্যাংকে কাজ করলেও ১৯৮২ সালে তিনি নিজের বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এপস্টিনের প্রতিষ্ঠানটি এতটাই সফল হয়ে ওঠে যে, তিনি শুধু সেসব গ্রাহকের কাজ করতেন যাদের সম্পদের পরিমাণ ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি। আমেরিকার বাইরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার সম্পত্তি ছিল; এমনকি ক্যারিবীয় অঞ্চলে তার নিজস্ব একটি ব্যক্তিগত দ্বীপও ছিল। বাস্তবে এই প্রভাব ও সম্পদের আড়ালে এপস্টিন বহু বছর ধরে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরীদের যৌন নিপীড়ন ও পাচারের একটি সংগঠিত আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন।
এপস্টিন নিয়মিতভাবে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সঙ্গে ওঠাবসা করতেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রু, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস, পপ তারকা মাইকেল জ্যাকসন, রাজনৈতিক চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি এবং টেক বিলিয়নিয়ার পিটার থিয়েলসহ আরও বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি।
২০০৫ সালে প্রথমবারের মতো এপস্টিনের গোপন জীবনের অন্ধকার দিক সামনে আসে। কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে জানায়, এপস্টিন ১৪ বছর বয়সী কিশোরীদের যৌন শোষণ করতেন। আরও গুরুতর অভিযোগ ওঠে, এপস্টিন তার ব্যক্তিগত বিমানে করে কোটিপতিদের নিজের দ্বীপে নিয়ে যেতেন এবং সেখানে পাচার করা কিশোরীদের ধনকুবের বন্ধুদের সাথে রাত্রিযাপন করতে বাধ্য করতেন। এত শক্তিশালী প্রমাণ থাকার পরও ২০০৮ সালে প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মার্কিন বিচার ব্যবস্থায় কারসাজির মাধ্যমে তিনি মাত্র ১৩ মাসের হালকা সাজায় পার পেয়ে যান।
২০১৮ সালে বিশ্বজুড়ে 'মি টু' আন্দোলন শুরু হলে এপস্টিনের অপকর্মগুলো পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রে আসে। এই আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আরও অনেক নারী তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন এবং একের পর এক অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিদেশে পাচারের গুরুতর তথ্য সামনে আসতে থাকে। সময় গড়ানোর সাথে সাথে বিষয়টি আরও ঘৃণ্য ও ঘোলাটে হয়ে ওঠে।
২০১৯ সালে মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকা অবস্থায় নিউ ইয়র্কের একটি কারাগারে এপস্টিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তবে এমন আলোচিত ও সংবেদনশীল মামলার আসামির এমন রহস্যজনক মৃত্যুতে পুরো আমেরিকায় গভীর রহস্য ও ষড়যন্ত্রের গুঞ্জন ছড়ায়। সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়।
মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পর একজন ফরেনসিক প্যাথলজিস্ট জানান, এটি আত্মহত্যা নয় বরং শ্বাসরোধ করে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড; কারণ এপস্টিনের গলার হাড় ভাঙা ছিল। একই সাথে জানা যায়, ঘটনার রাতে তার সেলের সিসিটিভি ক্যামেরা অকেজো ছিল এবং সেদিনের ফুটেজ হারিয়ে যায়। এমনকি বিচার বিভাগ পরবর্তীতে যে ফুটেজ প্রকাশ করে, সেখান থেকেও এক মিনিটের তথ্য গায়েব ছিল। এর ওপর, মৃত্যুর ঠিক একদিন আগে তার সেলমেটকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়। কেন তাকে একা রাখা হয়েছিল, রাতে কারা ডিউটিতে ছিল বা কে প্রথম মরদেহ দেখেছিল—এসবের স্পষ্ট কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। ফলে ধারণা তৈরি হয়, তালিকায় থাকা একাধিক প্রেসিডেন্ট ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের স্বার্থ রক্ষার্থেই তাকে হত্যা করে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়েছে।
এপস্টিন ও তার সহযোগী ঘিসলেন ম্যাক্সওয়েল প্রভাবশালীদের ফাদে ফেলে গোপন ভিডিও ও তথ্য সংগ্রহ করে ব্ল্যাকমেইল করতেন। এপস্টিনের মৃত্যুর পর ম্যাক্সওয়েলের ২০ বছরের সাজা হলেও জনমনে মূল রহস্য থেকে যায়। অভিযোগ ওঠে, এই পুরো কার্যক্রমের পেছনে ছিল ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। সাধারণ এক শিক্ষক থেকে রাতারাতি বিলিয়নিয়ার হওয়া, অঢেল সম্পত্তি ও আইনি ফাঁকফোকর গলে বের হওয়ার পেছনে মোসাদের মদদ ছিল বলে ষড়যন্ত্র গবেষকরা দাবি করেন। বলা হয়, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে ব্যাক-চ্যানেলে মার্কিন রাজনীতিবিদদের ব্ল্যাকমেইল করে তাদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ আনুগত্য আদায় করে আসছে, যা মার্কিন রাজনীতিতে ইসরায়েলের বিশাল প্রভাব তৈরির অন্যতম কারণ।
এদিকে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি প্রেসিডেন্ট হলে এপস্টিন ফাইলস প্রকাশ করবেন এবং দায়ীদের শাস্তির মুখোমুখি করবেন। তৎকালীন প্রশাসনিক ব্যক্তিরা এবং এফবিআই সংশ্লিষ্টরাও ফাইল প্রকাশের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে ট্রাম্প দাবি করেন, এই ফাইলের কোনো অস্তিত্বই নেই এবং এটি তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চক্রান্ত। তবে গণমাধ্যম ও ডেমোক্র্যাটদের চাপে মার্কিন কংগ্রেসে আইন পাস হওয়ায় বিচার বিভাগ ধাপে ধাপে হাজার হাজার নথি প্রকাশ করতে বাধ্য হয়। এখন পর্যন্ত প্রায় ১১ হাজার নথির ১ লাখ ৩০ হাজার পৃষ্ঠা প্রকাশ করা হয়েছে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রকাশিত এসব নথিতে ট্রাম্পের নাম ৬০০ বারেরও বেশি উল্লেখ রয়েছে। এতে তাদের গভীর সম্পর্কের প্রমাণ যেমন মেলে, তেমনি কারাগারে এপস্টিনের মৃত্যুর সাথে ট্রাম্পের কোনো যোগসূত্র ছিল কি না তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। অনেকেই মনে করেন, এপস্টিন ফাইলের চাঞ্চল্যকর তথ্য ও জনরোষ ধামাচাপা দিতে এবং মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও ভেনেজুয়েলায় আক্রমণের মতো সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যেখানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more