প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুন ২৬, ২০২৬, ৫:০৯ এ.এম
দা রিয়েল মাফিয়া: বিল গেটস
অ-অ+
বিল গেটসের অজানা অধ্যায়:
বিল গেটসের অজানা দিকগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পেতে হলে প্রথমেই তার জীবনীর সারাংশ জানা প্রয়োজন। ১৯৫৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল শহরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম তার। শুধু সম্ভ্রান্ত বললেও কম হয় আসলে। দাদা ছিলেন নামজাদা এক ব্যাংকার, বাবা ছিলেন প্রভাবশালী আইনজীবী ও দানবীর, আর মা ছিলেন একটি আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থার অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা। এক কথায়, সোনার চামচ মুখে নিয়েই জন্ম তার।
ছেলেবেলা থেকেই কম্পিউটার আর প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি প্রবল আগ্রহ ছিল বিলের। তৎকালীন সময়ে কম্পিউটার চোখে দেখেছে এমন মানুষ পাওয়াই যেখানে দুষ্কর ছিল, সেখানে ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান বিলের কম্পিউটার ব্যবহারের সুযোগ পেতে তেমন একটা বেগ পোহাতে হয়নি। প্রখর মেধাসম্পন্ন বিল মাত্র ১৩ বছর বয়সেই প্রথম প্রোগ্রাম লিখতে সক্ষম হন, যা তৎকালীন যুগ অনুযায়ী অত্যন্ত বিস্ময়কর ব্যাপার বটে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে বন্ধু পল অ্যালেনকে সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন তার প্রথম কোম্পানি, যার নাম ছিল ‘ট্রাফোডাটা’। তবে তাদের এই প্রথম উদ্যোগ খুব একটা সফলতার মুখ দেখেনি।
বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় ১৬০০ নম্বরের মধ্যে ১৫৯০ নম্বর পেয়ে হার্ভার্ডে ভর্তি হলেও অল্প দিনেই বিল গেটস বুঝতে পারেন, তার স্বপ্ন পূরণের জায়গা হার্ভার্ড নয়। ফলে মাত্র দুই বছরের মাথায় হার্ভার্ড ছেড়ে দেন তিনি। ১৯৭৫ সালে বাজারে আসে বিশ্বের প্রথম জনপ্রিয় অতিক্ষুদ্র কম্পিউটার ‘অলটায়ার ৮৮০০’। এটা নিয়ে ঘাটাঘাটি করতে গিয়ে বিল বুঝতে পারেন, এর কার্যক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজন একটি প্রোগ্রামিং ভাষার। বিল এবং পল এই কম্পিউটারের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘এমআইটিএস’-এর সাথে যোগাযোগ করে তাদের একটি প্রোগ্রামিং ভাষা তৈরি করে দেবার প্রস্তাব করেন। যদিও তখন পর্যন্ত তেমন কোনো প্রোগ্রামিং ভাষা তারা তৈরি করেননি। যাই হোক, প্রখর মেধাবী আর অদম্য পরিশ্রমী বিল ও পল মাস দুয়েক দিন-রাত খেটে প্রতিষ্ঠানটিকে কাঙ্ক্ষিত প্রোগ্রামিং ভাষাটি দিতে সক্ষম হন। সেই থেকে মাইক্রোসফটের যাত্রা শুরু। এরপর আর বিলকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
১৯৮০ সালটা ছিল মাইক্রোসফটের জন্য সবচেয়ে বড় মোড় পরিবর্তনকারী সময়। আগেই বলা হয়েছে, বিলের মা বেশ প্রভাবশালী একজন নারী ছিলেন। তৎকালীন সময়ে সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের একটি ছিল ‘আইবিএম’। তাদের ব্যক্তিগত কম্পিউটারের ব্যবসার জন্য একটি অপারেটিং সিস্টেম প্রয়োজন ছিল। বিলের মায়ের সুপারিশে এই অপারেটিং সিস্টেম তৈরির দায়িত্ব পায় মাইক্রোসফট। চতুর বিল এক নামহীন সফটওয়্যার কোম্পানির তৈরি অপারেটিং সিস্টেম কিনে নিয়ে কিছুটা রদবদল করে আইবিএম-এর কাছে হস্তান্তর করেন, যা পরবর্তীতে সারা বিশ্বে পরিচিতি পায় ‘এমএস-ডস’ নামে।
তবে আইবিএম-এর সাথে চুক্তি করার সময় বিল একটা শর্ত জুড়ে দেন। শর্ত অনুযায়ী, অন্যান্য কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও মাইক্রোসফট তাদের অপারেটিং সিস্টেম বিক্রি করতে পারবে। আইবিএম এই শর্তে রাজি হয়, আর এটাই সম্ভবত মানব ইতিহাসের সবচেয়ে লাভজনক চুক্তিগুলোর মধ্যে একটি।
১৯৮৫ সালে মাইক্রোসফট উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেমের প্রথম সংস্করণটি বাজারে ছাড়ে। আশির দশকের শেষ নাগাদ বিশ্বের আশি শতাংশ কম্পিউটারেই মাইক্রোসফটের অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করা শুরু হয়। ২০২৬ সালে এসেও চিত্র কিন্তু প্রায় একই ছিল। ওই চুক্তি যে কতটা লাভজনক ছিল, তা সহজেই অনুমেয়।
১৯৮৭ সালে মাইক্রোসফট তাদের তুমুল জনপ্রিয় ‘এমএস অফিস’ নিয়ে আসে। একে একে বাজারে ছাড়া হয় উইন্ডোজের বিভিন্ন যুগান্তকারী ও ব্যাপক জনপ্রিয় সংস্করণগুলো। সেই সাথে ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য জনপ্রিয় ওয়েব ব্রাউজার তৈরি করে তারা। এভাবে সফটওয়্যার শিল্পের একের পর এক শাখায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে মাইক্রোসফট।
কেউ দাঁড়াতেই পারছিল না মাইক্রোসফটের সামনে। এমনকি তাদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যাপলের অবস্থাও তখন শোচনীয়। পুরো শিল্পটাই কুক্ষিগত করে ফেলেছিলেন বিল গেটস। তবে এত সুখ কপালে সইলো না বেশি দিন। চারদিক থেকে প্রতিবাদের ঝড় উঠতে থাকে। অভিযোগ ওঠে, মাইক্রোসফট একচেটিয়া বাজারের নিয়ম ভঙ্গ করেছে, বাজারটা সম্পূর্ণ নিজের দখলে নিতে চাইছে এবং ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে দিচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে এই খাতে কোনো প্রতিযোগিতা থাকবে না, থাকবে না নিত্যনতুন চিন্তা ও উদ্ভাবনের মূল্যায়ন। ব্যস, মাইক্রোসফটের পতন শুরু হলো। শেয়ার মূল্যে নামলো ধস।
বিল গেটসকে আদালতে তলব করা হলো। তার আকাশছোঁয়া সম্মানে কালির আঁচড় লাগার শুরুও সেখান থেকেই। সাময়িক ধস সামলে মাইক্রোসফট তার আগের অবস্থানে ফিরতে পারলো ঠিকই, কিন্তু বিল তার আগের সম্মানের জায়গাটা আর ফিরে পেলেন না। সম্মান হারালে তা কি আর সহজে ফিরে পাওয়া যায়? তবে প্রচলিত কথা রয়েছে, টাকা থাকলে অনেক অসম্ভবই সম্ভব করা যায়। আর বিল গেটসের আর যাই হোক, টাকার অভাব নেই নিশ্চয়ই। বিল নেমে পড়লেন তার হারানো সম্মান পুনরুদ্ধারের কাজে। মানুষের সামনে নিজের ইতিবাচক ভাবমূর্তি কিভাবে তুলে ধরা যায়, সে কাজে সক্রিয় হলেন তিনি। স্ত্রী মেলিন্ডাকে সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন’, যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বেসরকারি দাতব্য সংস্থা। এই সংস্থার মাধ্যমে তারা প্রতি বছর কোটি কোটি ডলার দান করতে লাগলেন বিশ্বের নানা প্রান্তে।
তবে চতুর বিল ভালোভাবেই জানতেন, যত টাকাই দান-দক্ষিণা করুন না কেন, তা তেমন কোনো কাজে আসবে না যদি গণমাধ্যমকে নিজের আয়ত্তে না আনা যায়। যেমন ভাবা তেমন কাজ, কোটি কোটি ডলার ঢালা শুরু করলেন গণমাধ্যমের প্রচারণায়। বিশ্বের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমগুলোতে দেখা যায় বিল গেটসের বিশেষ সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে, তাকে নিয়ে আলাদা আলোচনা করা হচ্ছে। বিল গণমাধ্যমের সামনে সামাজিক, অর্থনৈতিক, স্বাস্থ্যগত বিষয়ে তার মতামত ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরছেন। বর্তমান সময়ে বিশ্বের আর কোনো ধনকুবেরকে কিন্তু এত বেশি গণমাধ্যমে দেখা যায় না।
তার প্রতিষ্ঠিত দাতব্য সংস্থার অনুদানের একটা বড় খাত হলো জনস্বাস্থ্য। মার্কিন সরকার আর চীন সরকারের পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় সবচেয়ে বেশি অনুদান দিয়ে থাকে তার এই সংস্থা। এর পেছনেও বিল গেটসের স্বার্থ রয়েছে। ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরির ব্যাপার তো আছেই, সেই সাথে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংক্রান্ত অনেক সিদ্ধান্তেই অনায়াসে নিজের প্রভাব রাখতে পারেন তিনি। বৈশ্বিক মহামারী যখন চরমে ছিল তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তার প্রভাব কেমন ছিল তা দেখা গেছে।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, জনস্বাস্থ্য নিয়ে মাথা ঘামিয়ে বিলের কি লাভ? এ প্রসঙ্গে আসা যাক। তার আগে একটা তথ্য জানা প্রয়োজন, বিল গেটস আমেরিকার সবচেয়ে বেশি পরিমাণ কৃষিজমির মালিক। তার মালিকানায় থাকা কৃষিজমির পরিমাণ ২ লক্ষ ৬৯ হাজার একরেরও বেশি। আর এর অনেকাংশই তিনি কিনেছেন মহামারীর লকডাউনের সময়, যখন জমির দাম অনেক কমে গিয়েছিল। এসব তথ্য অবশ্য ফাঁস হয়েছে পরে। জনসাধারণ যদি জানতে পারে যে মানুষটা মহামারীর সময় লকডাউনের পক্ষে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার ছিলেন, সেই তিনিই লকডাউনকে ব্যবহার করে নিজের আখের গুছিয়েছেন, তাহলে তো বিপদ! এ আশঙ্কায় বিল গেটস এসব খবর গোপন রেখেছিলেন। পরে অবশ্য গোপন থাকেনি তা।
মূলত বিল গেটসের উদ্দেশ্য জনস্বাস্থ্য খাতে নিজের প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে নিজের পরিকল্পনাগুলোকে বাস্তবে রূপান্তরিত করা। এত এত জমি তো শুধু শুধু কেনেননি তিনি। দেশের সবচেয়ে বড় ভূমির মালিক হওয়ায় কৃষি ক্ষেত্রেও তার প্রভাব থাকবে। আর কৃষির সাথে জনস্বাস্থ্য যে ওতপ্রোতভাবে জড়িত তা সবারই জানা। সেই সাথে বিভিন্ন কৃত্রিম ও পরিবর্তিত খাবার তৈরির গবেষণায় বিনিয়োগ করছেন তিনি। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করছেন পরীক্ষাগারে তৈরি মাংস খেতে। তিনি কৃত্রিম ও প্রক্রিয়াজাত খাবারেই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন এবং তা জোরালোভাবে প্রচারও করছেন। স্বাস্থ্য খাতে বিলের অমন কোটি কোটি ডলার অনুদান না থাকলে তার মতো একজন কম্পিউটার প্রোগ্রামার ও ব্যবসায়ীর এসব স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ কে শুনতো? ভবিষ্যতে এসব খাতে তিনি ভিন্ন ধরনের কোনো ব্যবসার ছক কষছেন কিনা সেটাও ভেবে দেখার বিষয়।
কিছুদিন আগেই বিলের সাথে দীর্ঘ সংসার জীবন ছিন্ন করেছেন মেলিন্ডা। এই বিবাহবিচ্ছেদের পেছনে অন্যতম কারণ কি ছিল? কুখ্যাত অপরাধী জেফরি এপস্টাইনের সাথে বিল গেটসের গোপন যোগসাজশের খবর ফাঁস হওয়া। বিল গেটস এ ব্যাপারে সোজা সাপ্টা জবাব দেননি কখনোই, এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেছেন বরাবরই। তবে এ বিষয়গুলো কি আর সহজে ধামাচাপা দিয়ে রাখা যায়? এভাবেই চলছে বিলের জীবন। বছরের পর বছর ধরে চেষ্টা চালাচ্ছেন মানুষের হৃদয়ে একটুখানি জায়গা করে নিতে। সফল হচ্ছেন কখনো কখনো, কখনোবা মুখ থুবড়ে পড়ছে তার গোটা পরিকল্পনা।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more