প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুন ২৯, ২০২৬, ২:৪৮ পি.এম
এই চরম ধ্বংসযজ্ঞের শেষ কোথায়?
অ-অ+
ইসরায়েলি আগ্রাসন:
গাজায় সাম্প্রতিক ইসরায়েলি আগ্রাসন মানবজাতির ইতিহাসের অন্যতম এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ ১৫ মাস একটানা সামরিক অভিযান ও বেসামরিক নাগরিক হত্যার পর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল। তবে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে সেই চুক্তি উপেক্ষা করে ইসরায়েল আবারও সেখানে ভয়াবহ হামলা শুরু করে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ধ্বংসযজ্ঞের নির্মম চিত্রগুলো যেকোনো বিবেকবান মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়। গাজার প্রায় পুরো অঞ্চলকে ইতিমধ্যে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে। চলমান এই পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের সম্পূর্ণ উচ্ছেদ বা নির্মূল না করা পর্যন্ত এই সামরিক অভিযান থামবে না। আধুনিক যুগের এই চরম মানবিক সংকটের ইতিহাস এবং এই সংঘাতের গভীরতা তলিয়ে দেখা এখন সময়ের দাবি।
অনেকেই মনে করেন ফিলিস্তিন সংকটের শুরু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে। পশ্চিমা গণমাধ্যম ও ইসরায়েলপন্থি মহল বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করে যেন এর আগে ফিলিস্তিনিদের ওপর কোনো ধরনের অন্যায় করা হয়নি। কিন্তু বাস্তব ইতিহাস বলছে, এই সংঘাতের সূচনা ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকেই। জাতিসংঘের প্রস্তাব মেনে ইসরায়েল স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও শুরু থেকেই তারা বিশ্ব সংস্থার নিয়মকানুন অমান্য করে আসছে। জাতিসংঘের মূল প্রস্তাবে ফিলিস্তিনিরা সংখ্যায় বেশি হওয়া সত্ত্বেও তাদের দেওয়া হয়েছিল মাত্র ৪৩ শতাংশ জমি, আর ইহুদিদের দেওয়া হয়েছিল ৫৭ শতাংশ। অথচ সেই সময়েই ইসরায়েল বলপূর্বক ফিলিস্তিনের ৭৩ শতাংশ অঞ্চল দখল করে নেয়। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে একের পর এক অবৈধ বসতি গড়ে তুলে পুরো ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে ক্রমান্বয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে তারা। এই অবৈধ ভূমি দখল, হত্যা ও লুণ্ঠনের প্রতিবাদে জাতিসংঘে বহুবার নিন্দা প্রস্তাব পাস হয়েছে। এমনকি জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ গঠনের পর থেকে সারাবিশ্বের যত অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিন্দা জানানো হয়েছে, তার একটি বড় অংশ এককভাবে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে। দীর্ঘ প্রায় আট দশক ধরে চলা এই নিয়মতান্ত্রিক আগ্রাসনের ইতিহাস পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের আগেও বহুবার এই দুই পক্ষের মধ্যে চরম সংঘাত তৈরি হয়েছে। তবে আরব দেশগুলোর সাথে হওয়া যুদ্ধগুলো বাদে ফিলিস্তিনিদের সাথে ইসরায়েলের বাকি সংঘাতগুলো সমমুখী যুদ্ধ ছিল না; বরং সেগুলো ছিল ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের আত্মরক্ষার প্রতিরোধ। ৭ অক্টোবরের হামাসের অভিযানের আগে সর্বশেষ বড় সংঘর্ষ হয়েছিল ২০২১ সালের মে মাসে। ইসরায়েল দাবি করে যে হামাস পূর্ববর্তী শান্তি চুক্তি ভঙ্গ করেছে, যা বাস্তবসম্মত নয়। কারণ ৭ অক্টোবরের অভিযানের মাত্র ১২ দিন আগেও ইসরায়েল গাজায় একটানা তিন দিন বিমান হামলা চালিয়েছিল এবং একই মাসের ৪ তারিখে গাজার বহু মানুষের পায়ে গুলি করে পঙ্গু ও আহত করা হয়েছিল। শুধু গাজায় নয়, পশ্চিম তীরেও ২০২৩ সালের প্রথম দিকে ইসরায়েলি বাহিনী এত বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছিল যে মানবাধিকার সংস্থাগুলো ২০২৩ সালকে ফিলিস্তিনিদের জন্য অন্যতম রক্তাক্ত ও ভয়াবহ বছর হিসেবে ঘোষণা করেছিল। অর্থাৎ, ৭ অক্টোবরের আগেই ইসরায়েল একের পর এক উসকানি ও হামলা চালিয়ে এই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত করে করেছিল।
ইসরায়েল সবসময়ই তাদের এই সামরিক অভিযানকে বিভিন্ন প্রচারণার মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করে আসছে। হামাস দমনের অজুহাতে তারা গাজার ২০ লক্ষাধিক মানুষের জীবনকে এক জীবন্ত নরকে পরিণত করেছে। মাটির নিচে সামরিক ঘাঁটি থাকার দাবি তুলে গাজার প্রায় প্রতিটি হাসপাতাল, স্কুল ও আশ্রয়কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ বিশ্বমানবতার কথা বলা পশ্চিমা দেশগুলোর অনেকেই এই প্রশ্ন তোলে না যে, একটি নির্দিষ্ট সংগঠনকে দমনের নামে কেন লাখ লাখ সাধারণ বেসামরিক মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে এবং পুরো একটি অঞ্চলকে মাটির সাথে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই বিষয়ে ইসরায়েলের দাবি হলো—গাজাবাসী যেহেতু ২০০৬ সালের নির্বাচনে হামাসকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছিল, তাই এর দায় সবাইকে নিতে হবে। কিন্তু বাস্তব তথ্য হলো, বর্তমানে গাজার অধিকাংশ বাসিন্দাই শিশু বা অপ্রাপ্তবয়স্ক, ২০০৬ সালে যাদের জন্মই হয়নি। আর যারা সে সময় জীবিত ছিল, তাদেরও বড় অংশের ভোট দেওয়ার বয়স ছিল না। এমনকি সেই নির্বাচনেও হামাস সামগ্রিক জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পায়নি। ফলে এই ধরনের যুক্তি দিয়ে মূলত তারা আন্তর্জাতিক মহলে নিজেদের সামরিক পদক্ষেপকে আড়াল করতে চায়। এই চরম উগ্রতার পেছনে রয়েছে ইসরায়েলের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক মানসিকতা। বিভিন্ন গবেষণা ও বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলি শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ফিলিস্তিনিদের প্রতি তীব্র নেতিবাচক ধারণা দিয়ে বড় করা হয়। তাদের পাঠ্যবইগুলোতে ফিলিস্তিনিদের সবসময় সমাজবিরোধী বা অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করার অভিযোগ রয়েছে। সেখানে ফিলিস্তিনিদের সংস্কৃতি, কষ্ট বা দীর্ঘ ইতিহাসের ইতিবাচক দিকগুলো স্থান পায় না। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে তারা ফিলিস্তিনিদের হিব্রু বাইবেলে বর্ণিত তাদের প্রাচীন শত্রু 'আমালেক' জাতির সাথে তুলনা করে, যাদের নাম-নিশানা সম্পূর্ণ মুছে ফেলার ধর্মীয় তত্ত্ব রয়েছে। এই ধরনের উগ্র মানসিকতার কারণেই ফিলিস্তিনের সাধারণ নাগরিকদের ওপর নির্বিচারে আক্রমণ চালিয়েও ইসরায়েলি বাহিনীর অনেক সদস্যের মধ্যে কোনো অনুশোচনা দেখা যায় না, বরং তারা এটি নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করে।
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদদের মতে, ইসরায়েল বর্তমানে তার জায়নবাদী এজেন্ডা বাস্তবায়নের এমন এক পর্যায়ে চলে এসেছে যা চরম সহিংসতার রূপ নিয়েছে। ইতিহাসের দিকে تাকালে দেখা যায়, যেকোনো বড় সাম্রাজ্য বা ঔপনিবেশিক শক্তি তাদের পতনের ঠিক পূর্বমুহূর্তে সর্বোচ্চ হিংস্র হয়ে ওঠে। অতীতে মিশরীয়, রোমান, মঙ্গোল কিংবা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মতো প্রতাপশালী শক্তিগুলোর পতনও হয়েছিল তাদের নিজেদের তৈরি চরম সহিংসতার মধ্য দিয়ে। ফিলিস্তিনের অসহায় মানুষের ওপর ইসরায়েলের এই পাপাচার ও নির্মমতা যত সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক মহলে তাদের নৈতিক অবস্থান ততটাই দুর্বল হচ্ছে। এই চরম অবিচারের অবসান এবং প্রকৃতির নিয়মে এই আগ্রাসনের পতন এখন কেবলই সময়ের ব্যাপার বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more