প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: আগস্ট ০৬, ২০২৬, ৫:৪৫ এ.এম
ইরাননীতিতে মার্কিন ক্ষমতার ধাঁধা
অ-অ+
অনলাইন ডেস্ক:
ইরানের রাজনৈতিক ও কৌশলগত আচরণ বুঝতে না পেরে প্রায় চার দশক ধরে হিমশিম খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বজুড়ে সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও তেহরানের শীর্ষ ক্ষমতার সমীকরণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া মার্কিন প্রেসিডেন্টদের কাছে এক জটিল ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি তেহরানের সঙ্গে চলমান নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে সাবেক প্রেসিডেন্টদের মতো বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও একই ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।
সম্প্রতি ইরানের ভূমিকা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প খোলামেলা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তেহরানের বিরুদ্ধে 'প্রতারণার' অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ইরানের নেতারা তাঁর ক্ষোভ বাড়িয়ে তুলছেন। হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক রাখা এবং সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে পর্দার আড়ালে আলোচনা চললেও ইরান নিজেদের দাবিতে অনড় রয়েছে। প্রণালি দিয়ে চলাচলের ওপর শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে তেহরান কঠোর অবস্থান নেওয়ায় মার্কিন প্রশাসন চরম হতাশায় পড়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে মার্কিন অর্থনীতি ও সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও প্রেসিডেন্টের সংকট
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে হোয়াইট হাউসে আসা প্রায় প্রতিটি মার্কিন প্রেসিডেন্টই ইরানকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার শিকার হয়েছেন। জিমি কার্টার, রোনাল্ড রিগ্যান, বিল ক্লিনটন থেকে শুরু করে ডোনাল্ড ট্রাম্প—প্রত্যেকেই ইরানের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা ও নেতৃত্বের মনস্তত্ত্ব বুঝতে গিয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক খেসারত দিয়েছেন। এর মধ্যে কেবল বারাক ওবামা ২০১৫ সালে ২০ মাসের দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যদিও ঘরোয়া রাজনীতিতে তাঁকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল, তবে চুক্তিটিকে তিনি নিজের অন্যতম কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করতেন।
সামরিক বলপ্রয়োগ ও ভুল হিসাব-নিকাশ ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প একদিকে যেমন সর্বোচ্চ সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছেন, অন্যদিকে আবার একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চরম ব্যাকুলতাও দেখিয়েছেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষে ইসরায়েলের সঙ্গে যৌথ হামলার মাধ্যমে তেহরান-ওয়াশিংটন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দীর্ঘ ৪০ বছর ক্ষমতায় থাকা সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। মার্কিন প্রশাসন ভেবেছিল এর ফলে ইরানে সরকারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থান ঘটবে এবং ক্ষমতার পরিবর্তন সহজ হবে।
তবে বাস্তব চিত্র হয়েছে উল্টো। গণ-অভ্যুত্থানের বদলে দেশটির কট্টরপন্থী ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হয়। মার্কিন বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার ছেলে মোজতবা খামেনি ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নতুন এই নেতা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো আলোচনার প্রস্তাব পাত্তাই দেননি, বরং পারমাণবিক নীতিতে তাঁর অবস্থান পূর্বসূরির চেয়েও কঠোর বলে মার্কিন কর্মকর্তারা ইঙ্গিত করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন সিআইএর সাবেক বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা পর্ষদের কর্মকর্তা কেনেথ পোলাক মনে করেন, ট্রাম্প হলেন ইরান নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চার দশকের দীর্ঘ ব্যর্থতা ও হতাশার সবচেয়ে বড় প্রতীক। তাঁর মতে, চরম বলপ্রয়োগ এবং একই সঙ্গে চুক্তির জন্য অতিরিক্ত উদগ্রীবতা—কোনো পথেই যুক্তরাষ্ট্র তার মূল কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।
একদিকে হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা এবং তেলের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি, অন্যদিকে যুদ্ধ নিয়ে ক্লান্ত মার্কিন ভোটারদের ক্ষোভ—সব মিলিয়ে তেহরানকে বুঝতে না পারার মাশুল এখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয়ভাবেই গুনতে হচ্ছে ওয়াশিংটনকে।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more