প্রিন্ট এর তারিখ: ||প্রকাশের তারিখ: জুলাই ০৩, ২০২৬, ১২:৫৬ পি.এম
সক্রেটিস: সত্যের সন্ধানে এক অমর জীবন
অ-অ+
অ্যাথেন্সের এক অস্থির অধ্যায়:
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৯ সালের অ্যাথেন্স ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত। গণতন্ত্রের পীঠস্থান হিসেবে পরিচিত এই নগরীতে তখন ব্যক্তিস্বাধীনতা ও প্রথাগত বিশ্বাসের মধ্যে চলছিল এক অদৃশ্য লড়াই। এই অস্থির সময়ের কেন্দ্রে ছিলেন সক্রেটিস নামক এক দার্শনিক, যিনি কোনো পুঁথিগত বিদ্যা নয়, বরং মানুষের যুক্তিবোধকে জাগ্রত করতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্র যখন তাকে বিচারে দাঁড় করালো, তখন সেটি কেবল একজন ব্যক্তির বিচার ছিল না; সেটি ছিল মুক্তচিন্তা বনাম বদ্ধমূল ধারণার এক চূড়ান্ত সংঘাত।
সক্রেটিক মেথড: প্রশ্নই যখন উত্তর: সক্রেটিস বই লিখে জ্ঞান প্রচারের চেয়ে সরাসরি মানুষের সাথে কথা বলে সত্য অন্বেষণে বেশি বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি ‘সক্রেটিক মেথড’ বা প্রশ্নোত্তর পদ্ধতির উদ্ভাবক ছিলেন। অ্যাথেন্সের বাজারে দাঁড়িয়ে তিনি সাধারণ মানুষকে এমন সব প্রশ্ন করতেন, যা তাদের নিজেদের অজ্ঞতা সম্পর্কে সচেতন করে তুলত। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ যখন নিজের ভুলগুলো বুঝতে পারে, তখনই প্রকৃত জ্ঞানের পথ উন্মোচিত হয়। তবে তার এই পদ্ধতি প্রভাবশালী ও অহংকারী ব্যক্তিদের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, কারণ এটি তাদের মিথ্যার মুখোশ খুলে দিচ্ছিল।
বিচারের কাঠগড়া ও আপসহীন দর্শন:
অ্যাথেন্সের আইনসভার সামনে যখন সক্রেটিসকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়, তখন রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে যুবকদের বিভ্রান্ত করা ও নতুন দেবতা প্রবর্তনের অভিযোগ আনে। কিন্তু বিচারে তিনি নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য বিন্দুমাত্র আপস করেননি। তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেছিলেন, "পরীক্ষা করা হয়নি এমন জীবন মানুষের বেঁচে থাকার যোগ্য নয়।" বিচারকদের সামনে তিনি বিনয়ের চেয়ে সত্যের গুরুত্বকে বড় করে তুলে ধরেছিলেন, যা তার মৃত্যুদণ্ডকে নিশ্চিত করে দেয়।
বিষের পেয়ালা ও অমরত্বের পথে যাত্রা:
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে তার শিষ্যরা তাকে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। সক্রেটিস সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আইনকে সম্মান জানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি শান্তভাবে বিষমিশ্রিত হেমলকের পেয়ালা হাতে তুলে নিলেন এবং হাস্যোজ্জ্বল মুখে তা পান করলেন। মৃত্যুর সেই মুহূর্তেও তিনি শিষ্যদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে, মৃত্যু কেবল শরীরের বিনাশ, আত্মার নয়। তার এই মৃত্যু অ্যাথেন্সের ইতিহাসকে যেমন কলঙ্কিত করেছিল, তেমনি তাকে করে তুলেছিল দর্শন ইতিহাসের এক অবিসংবাদিত নায়ক।
কেন সক্রেটিস আজও প্রাসঙ্গিক?
সক্রেটিস দেহত্যাগ করেছেন প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে, কিন্তু তার দর্শন আজও মানবসভ্যতার আলোকবর্তিকা। প্রশ্ন করার অধিকার, সত্যের প্রতি অবিচল থাকা এবং নিজের ভুল স্বীকার করার সাহস—এই মূল্যবোধগুলো আজকের অস্থির বিশ্বে আরও বেশি জরুরি। সক্রেটিসের জীবন আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, অন্ধ বিশ্বাসের চেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত সংশয় অনেক বেশি শক্তিশালী এবং একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার যুক্তিবোধের মাঝেই নিহিত।
We may use cookies or any other tracking technologies when you visit our website, including any other media form, mobile website, or mobile application related or connected to help customize the Site and improve your experience.
learn more